সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

মানিকদার চেষ্টা থাকত জয় করার, কাউকে পরাস্ত করা নয়

চারণিক ও প্রগ্রেসিভ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন (পিসিএআই)-র উদ্যোগে পথিকৃৎ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, শিল্প-সাহিত্য জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মানিক মুখোপাধ্যায়ের স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় ২৩ নভেম্বর কলকাতার মৌলালী যুবকেন্দ্রে। সভাপতিত্ব করেন পথিকৃৎ-এর বর্তমান সম্পাদক শ্রী স্বপন ঘোষাল। প্রারম্ভিক ভাষণে পথিকৃৎ-এর প্রকাশক অঞ্জনাভ চক্রবর্তী বলেন, মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে প্রগতিশীল শিল্প-সাহিত্যের জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হল। এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী দার্শনিক শিবদাস ঘোষের সুযোগ্য ছাত্র এবং একনিষ্ঠ অনুগামী হিসাবে মানিক মুখোপাধ্যায় প্রথমে পথিকৃৎ পত্রিকা ও পরে পথিকৃৎ সাংস্কৃতিক সংগঠনকে গড়ে তোলা ও তাকে জনমানসে সুপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে এ বিষয়ে একজন অথরিটি হিসাবে গড়ে তোলেন। পথিকৃৎ তাঁর এই আরাধ্য কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি সভাপতির নাম প্রস্তাব করেন এবং তা সমর্থন করেন পিসিএআইয়ের রাজ্য আহ্বায়ক কুমকুম সরকার। এরপর মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য পাঠ করেন পথিকৃৎ-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে শুরু করে বর্তমানের বিশিষ্ট সংগঠক ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক কাঞ্চন দাশগুপ্ত। প্রথমে বক্তব্য রাখেন চারণিকের সম্পাদক শ্রী সুকুমার কর্মকার। তিনি বলেন, চারণিকের সভাপতি হিসাবে মানিক মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন সময়ে, নানা মূল্যবান উপদেশ ও পথনির্দেশের মাধ্যমে তাঁদের নাট্যচর্চাকে পরিশীলিত ও উদ্দেশ্যমুখী হতে সাহায্য করে গেছেন। এরপর প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল বাশার তাঁর দীর্ঘ স্মৃতিচারণে বলেন, যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি মানিক মুখোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে আসেন এবং গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। মানিক মুখোপাধ্যায় প্রায়ই মুর্শিদাবাদে যেতেন। তখন তাঁর সঙ্গে বাশার সাহেবের সাহিত্য-শিল্প-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হত। তিনি সেই সময় মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে প্রকাশিত 'ঝড়' এবং 'রৌরব' পত্রিকার সঙ্গে খানিকটা যুক্ত ছিলেন। 'ঝড়ের' প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত অচিন্ত্য সিংহকে বাশার সাহেব অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। অচিন্ত্য সিংহের মাধ্যমেই মানিক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বাশারের পরিচয়। মানিক মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই তিনি শিবদাস ঘোষের বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও বক্তব্য সম্বন্ধে অবহিত হন এবং অনুপ্রেরণা লাভ করেন। শিবদাস ঘোষের উক্তি- 'বিপ্লবী রাজনীতি উচ্চতর হৃদয়বৃত্তি'- তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। পরবর্তী সময়ে সাহিত্যচর্চার সুবাদে তিনি কলকাতায় চলে আসেন এবং আনন্দবাজার গোষ্ঠীতে যোগ দেন। ফলে মানিক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিয়মিত সান্নিধ্যে বাধা পড়ে। পরে তিনি তাঁর সাহিত্য রচনাতেই মনোনিবেশ করেন। এইভাবে মানিক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের একটা ছেদ পড়ে। কিন্তু মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাতে কোনও ভাটা পড়েনি। সাহিত্যিক বাশার মুক্তকণ্ঠে কবুল করেন যে একটা সময়ে-একদিকে মানিক মুখোপাধ্যায়ের অনুসৃত আদর্শ ও সাহিত্য চিন্তা অনুগমন ও সাহিত্যকে জীবিকা নির্বাহের পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার হাতছানি- এই দোটানায় তিনি পড়ে যান এবং শেষপর্যন্ত তিনি দ্বিতীয়টিকেই বেছে নেন। আজ পরিণত বয়সে এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ হয়। মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। এরপর বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন স্বল্পকাল তিনি মানিক মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং একত্রে আন্দোলন করার অবকাশ পান। তখন তিনি মানিকবাবুর চরিত্রের সারল্য অমায়িকতা, বিন্দুমাত্র অহংবোধ না থাকা এবং তাঁর চিন্তার গভীরতায় মুগ্ধ হন। তিনি মানিক মুখোপাধ্যায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে একটি সঙ্গীত পরিবেশন করেন। সর্বশেষে পথিকৃতের প্রবীণ সদস্য, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ডঃ ধ্রুবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় তাঁর স্মৃতিচারণায় কীভাবে তিনি পথিকৃৎ-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং প্রথম আলাপেই মানিক মুখোপাধ্যায়ের চারিত্রিক মাধুর্য এবং সরল ব্যবহারে অভিভূত হন তা বলেন। তারপ দীর্ঘ সময় ধরে মানিক মুখোপাধ্যায়ের সাথে সাহিত্যচর্চা ও শিল্প বিষয়ক নানা দিক নিয়ে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে আজকের যুগে যথার্থ শিল্প-সাহিত্য রচনার উদ্দেশ্য ও রূপ কেমন হবে, তার সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন। মানিক মুখোপাধ্যায়ের জীবন্ত সাহচর্য এবং উদ্দীপক নির্দেশে একজন বৈজ্ঞানিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে পথিকৃৎ বিক্রি করেন এবং চাঁদা সংগ্রহ করেন। একসময় সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতা নিয়ে রাজ্য জুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। তখন মানিকবাবুর পরিচালনায় পথিকৃৎ একটা আন্দোলন গড়ে তোলে এবং সাহিত্যে কোনটা শ্লীল কোনটা অশ্লীল তা বিচারের মাপকাঠি এবং কেন তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি তা যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবী এবং চিন্তাশীল মহলে বিশেষ সমাদর আদায় করে নেয়। এরপর যখন তৎকালীন সিপিএম পরিচালিত রাজ্য সরকার প্রাথমিক স্তরে ইংরেজি ও পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেয়, তখন এর বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক শিক্ষা আন্দোলনে রাজ্যের প্রথম সারির শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক বৈজ্ঞানিক, সাংবাদিক, চিকিৎসদের সামিল করানোতে মানিক মুখোপাধ্যায় এক অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। কেউ কোনও দিন ভাবতে পারেননি যে 'ভাষাচার্য সুকুমার সেন', ডঃ সুশীল কুমার মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রমথনাথ বিশী, মনোজ বসু, প্রতুল গুপ্ত, রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত, শৈলেশ দে প্রমুখ দিকপালেরা রাস্তায় নেমে অবস্থান ধর্মঘট করবেন। এই সময় এঁরা প্রত্যেকে মানিকবাবুর গুণমুগ্ধ হয়ে পড়েন এবং তাঁর নেতৃত্বও মেনে নেন। এই আন্দোলন ১৯ বছর চলার পর বিজয়ী হয়। এরপর মানিকবাবুর উপর ভার পড়ে শিবদাস ঘোষের চিন্তাকে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার। লন্ডনে অনুষ্ঠিত একটি শরৎ-জয়ন্তীতে মানিকবাবু আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে যান এবং শিবদাস ঘোষের যুক্তিনিষ্ঠ অনন্য বিশ্লেষণের আলোকে শরৎ সাহিত্যের উপর মনোজ্ঞ আলোচনায় সকলের মন জয় করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থী মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং নানা দেশে ঘুরে ঘুরে শিবদাস ঘোষের চিন্তা-আদর্শকে ছড়িয়ে দেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মঞ্চ গড়ে তোলেন যার সভাপতি হন আমেরিকার প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল র‍্যামসে ক্লার্ক এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মানিক মুখোপাধ্যায়। এই মঞ্চের আহ্বানে কলকাতা, লেবানন এবং ঢাকায় তিনটি সম্মেলন হয়, যাতে আমেরিকা, রাশিয়া, জার্মানি, তুরস্ক, জর্ডন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ প্রমুখ দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এই সমস্ত আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের কাছেও মানিকবাবুর ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। তাঁদের সাথে মানিকবাবুর সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অর্থাৎ যখন যেখানে যে কাজের দায়িত্ব মানিক মুখোপাধ্যায় পেয়েছেন সেটাকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে পালনই করেননি, তার সুষ্ঠু সম্পাদনও করেছেন। সভার শেষে সভাপতি স্বপন ঘোষাল বলেন যে, মানিক মুখোপাধ্যায় কখনও অলোচনায় কাউকে পরাস্ত করার চেষ্টা করেননি, চেষ্টা করেছেন জয় করতে। যাঁরাই তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন তারা কেউই তাঁর আকর্ষণ অস্বীকার করতে পারেননি। ¤ (পথিকৃৎ-এর জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte