সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

"হোমবাউন্ড" : প্রকাণ্ড অন্ধকারে ছোট্ট প্রদীপের শিখা

শ্রীরূপা বন্দ্যোপাধ্যায়

গল্পটা আদ্যন্ত বন্ধুত্বের। আজকের দিনে ‘বন্ধু’ শব্দটাই যখন ক্রমাগত কেমন একটা আবছা স্মৃতির রূপ নিচ্ছে, তখন শোয়েব আর চন্দনের বেঁচে থাকার, চারিদিক দিয়ে ঘিরে ফেলা দমবন্ধ পাঁকের ভেতর থেকে মাথা তুলে মুক্ত আকাশে শ্বাস নেওয়ার লড়াই, আর সেই লড়াইয়ের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা একজনের প্রতি অন্যজনের গভীর ভালবাসা, ভরসা আর দায়বদ্ধতা দর্শকদের যেন নাড়িয়ে দিয়ে বলে যায়, এই-ই তো মানুষের সঙ্গে মানুষের সত্যিকারের সম্পর্ক, বন্ধুত্বের এই অনুভূতি তো সভ্যতারই অমূল্য উপহার। ‘হোমবাউন্ড’ সিনেমাটির কথা বলছি। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সাংবাদিক বাশরাত পীরের ‘টেকিং অমৃত হোম’ রচনার সূত্র ধরে এই ফিল্ম তৈরি করেছেন পরিচালক নীরজ ঘাওয়ান। কোভিডকালে আচমকা লকডাউনের সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে যখন পরিযায়ী শ্রমিকরা দলে দলে পায়ে হেঁটে, লরি বোঝাই করে কোনও মতে ঘরে ফেরার পথ ধরছিলেন, সেই সময়ে খবরের কাগজে বেরনো একটা ছবি হয়তো অনেকেরই মনে আছে। রাস্তার ধারে পা ছড়িয়ে বসে আছেন এক তরুণ। তাঁর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা আর এক তরুণের চোখবন্ধ মুখের ওপর ঝুঁকে রয়েছে তাঁর আকুল দৃষ্টি। পাশে পড়ে খোলা জলের বোতল আর একটা লাগেজ ব্যাগ। ক্যাপশন থেকে জানা গিয়েছিল, একই গ্রামের বাসিন্দা এই দুই পরিযায়ী শ্রমিক ছোটবেলার বন্ধু। লকডাউনে বাড়ি ফেরার পথে একজনের হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে। মৃতদেহ কোলে নিয়ে অকূল পাথারে পড়েছেন ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত আরেকজন, কী করে বন্ধুর শব নিয়ে গ্রামে ফিরবেন। ছবিটিতে ফুটে ওঠা একটা আকুল অসহায়তা মন ছুঁয়েছিল অনেকেরই। আর একটা বিষয়ও ধাক্কা দিয়েছিল, দুই তরুণের একজন হিন্দু, অপরজন মুসলমান। কারণ ততদিনে দেশের কোণে কোণে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর আয়োজন অনেকটাই সম্পূর্ণ করে ফেলেছে কৌশলী শাসকরা। বন্ধু-প্রতিবেশীর পারস্পরিক সম্পর্ক, আস্থা, বিশ্বাসে অনেকটাই চিড় ধরাতে সমর্থ হয়েছে তারা। ছবিটিতে দুই তরুণের বন্ধুত্ব, একের প্রতি অন্যের সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ নাড়া দিয়েছিল বাশরাত পীরকে। তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সাইয়ুব আর অমৃতের গ্রামে, জেনে নিয়েছিলেন তাদের বন্ধুত্ব আর লড়াইয়ের কাহিনির খুঁটিনাটি। তৈরি হয়েছিল ‘টেকিং অমৃত হোম’ নিবন্ধ, যেটি ‘হোমবাউন্ড’ ফিল্মের ভিত্তি। ফিল্মটি বানাতে গিয়ে দেশের খেটেখাওয়া মানুষের আর্থিক দুরবস্থা, ধর্ম ও জাতপাতকে কেন্দ্র করে সমাজ জুড়ে বইতে থাকা ঘৃণার স্রোত, যা দিনে দিনে প্রকটতর করে তোলার চেষ্টা চলছে, পরিচালক নীরজ ঘাওয়ান যেন চিরে চিরে সে সব দেখিয়েছেন। কিন্তু এটাই সব নয়। এত দুর্দশা, অবিচারের যন্ত্রণা আর ঘৃণার দাপট ছাপিয়ে মানুষে মানুষে প্রাণের সম্পর্ক, গভীর ভালবাসা ও একের প্রতি অপরের সহমর্মিতা, গোটা সিনেমা জুড়ে তাজা ফুলের সৌরভের মতো সেই মানবিক সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিয়েছেন নীরজ। ‘হোমবাউন্ড’-এর কাহিনী এগিয়েছে এ দেশের কোনও একটি গ্রামের মহম্মদ শোয়েব আলি আর চন্দনকুমার বাল্মিকী, মুসলমান আর দলিত সম্প্রদায়ের নিতান্ত দরিদ্র খেটেখাওয়া পরিবারের দুই তরুণকে কেন্দ্র করে। ধর্ম আর জাতপাতের বৈষম্যের ঠিকাদারদের দাপটে কোণঠাসা দুই তরুণই স্বপ্ন দেখে পুলিশ কনস্টেবল হওয়ার। উর্দিধারী সরকারি চাকরির তকমা তাদের মর্যাদা নিয়ে বাঁচবার অধিকার দেবে এই আশায় প্রাণপাত পরিশ্রম করে চাকরির পরীক্ষা দেয় তারা। যদিও কনস্টেবলের চাকরি পাওয়ার পরেও ‘দলিত’ পরিচয় জেনে পাছে অসম্মানের শিকার হতে হয়, সেই ভয়ে পদবী গোপন করে শুধু ‘চন্দন কুমার’ নামটুকুতেই নিজের পরিচয় সীমাবদ্ধ রাখতে হয় একজনকে। তার ভাগ্যে চাকরির শিকে ছিঁড়লেও সরকারের মর্জিতে নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া হয় দীর্ঘ দিনের জন্য। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে আর ভাঙা ঘরের জায়গায় একটা পাকা বাড়ি তৈরির প্রাণপণ ইচ্ছায় সুরাটের কাপড়-কলে কাজ নিতে হয় চন্দনকে। অন্য দিকে চাকরির পরীক্ষায় বিফল শোয়েব কাজ নেয় এক বেসরকারি সংস্থায়। নিজের দক্ষতা প্রমাণ করা সত্ত্বেও সেখানে নিজের ধর্ম পরিচয়ের জন্য পদে পদে জুটতে থাকে অসম্মান। শেষে অপমান আর সহ্য করতে না পেরে একদিন কাজে ইস্তফা দেয় শোয়েব। তারও জায়গা হয় সুরাটের কাপড়-কলে। এরপর দুই বন্ধু, কারখানার দুই শ্রমিকের দিন কাটতে থাকে নিজস্ব ছন্দে। কিন্তু হঠাৎ কোভিড অতিমারী ও আচমকা লকডাউনের ঘোষণায় সব এলোমেলো হয়ে পড়ে। কারখানা বন্ধ, কাজ নেই, দিন চালাবার মজুরি নেই, পরিযায়ী শ্রমিকরা পুলিশের লাঠি অগ্রাহ্য করে দলে দলে ঘরে ফেরার জন্য রওনা হতে থাকেন। শোয়েব আর চন্দনও তাদের থাকার জায়গা ছেড়ে একদিন বেরিয়ে পড়ে ঘরের পথে। অমানুষিক সেই যাত্রাপথে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় চন্দন। তার মৃতদেহ কোলে নিয়ে, ঠিক কাগজে বেরনো ফোটোটির মতো পথের ধুলোয় বসে থাকে শোয়েব। ফিল্মের গল্প এর পরে আরও খানিক এগোয়। চন্দনের স্বপ্নের পাকাবাড়ি বানানো শেষ করে শোয়েব। তার বাবা ততদিনে চিকিৎসা পেয়ে হাঁটতে পারছেন। একদিন চন্দনের পুলিশের চাকরির সরকারি চিঠিও এসে পৌঁছয়। সেই চিঠি সই করে হাতে নেয় শোয়েব। শোয়েবকে কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করতেও দেখা যায়। এ ভাবেই এত দুর্দশা, যন্ত্রণা, স্বপ্নভঙ্গের মাঝে খানিকটা আশার সুর শুনিয়ে শেষ হয় ‘হোমবাউন্ড’। দর্শক বসে থাকেন দেশের সমাজবাস্তবতার ভয়াবহতার ভার বুকে নিয়ে। কাহিনী বুনতে বুনতে আজকের ভারতের আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলিকে একটার পর একটা অসাধারণ দক্ষতায় তুলে ধরেছেন পরিচালক নীরজ ঘাওয়ান। ফিল্মের প্রতিটি দৃশ্যে ফুটে উঠেছে সৌন্দর্যবোধ ও পরিমিতিবোধ। আরও উল্লেখ্য, বেকার সমস্যা, চূড়ান্ত গরিবি, মুসলমান বিদ্বেষ, জাতপাতের বৈষম্যের মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলি তুলে ধরতে গিয়ে নীরজ কিন্তু কোথাও সিনেমাটিকে স্লোগানধর্মী করে ফেলেননি। সুদক্ষ পরিচালনা ও সম্পাদনার কারণে এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়েমি ছুঁতে পারে না দর্শকদের। অভিনেতারাও প্রাণ ঢেলে অভিনয় করেছেন। শোয়েব চরিত্রে ঈশান খট্টর, চন্দন চরিত্রে বিশাল জেঠওয়া, শোয়েবের অফিসের সাম্প্রদায়িক মানসিকতার এক কর্তার চরিত্রে যোগেন্দ্র বিক্রম সিং এবং চন্দনের মায়ের চরিত্রে শালিনী বৎসের নাম বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। নরেন চন্দাভারকর ও বেনেডিক্ট টেলর নির্মিত আবহসঙ্গীত প্রতিটি দৃশ্যকে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। সিনেমাটি শুরুই হয় সরকারি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে থাকা পরীক্ষার্থীদের ভিড়ে একটা শ্বাসরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়া উদভ্রান্ত চন্দন আর শোয়েবের দৃশ্যটি দিয়ে। পরীক্ষা দিতে যাওয়ার জন্য রেল স্টেশনে চাকরিপ্রার্থী ছেলেমেয়েদের অসম্ভব ভিড় আর তুমুল ব্যস্ততা। সেখানে সেই ঠাসা ভিড়ের মাঝে, আগামী দিনে যে মেয়েটি চন্দনের বান্ধবী হয়ে উঠবে, সেই সুধার সঙ্গে দেখা হওয়া ও কথাবার্তার মধ্যে মুহূর্ত কয়েকের যে স্নিগ্ধতাটুকুর সৃষ্টি হয়, পরিচালক আচমকাই তা ছিঁড়েখুঁড়ে দেন শেষ মুহূর্তে ট্রেনের প্ল্যাটফর্ম বদলের ঘোষণার মধ্য দিয়ে। প্রাণ হাতে করে লাইন পেরিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পরীক্ষার্থীর সঙ্গে ট্রেন ধরতে দৌড়য় চন্দন ও শোয়েব। কোথায় হারিয়ে যায় সুধা। তাদের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকও যেন অনুভব করতে থাকেন দেশের ভয়াবহ বেকার সমস্যার ভার। চন্দনদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তাঁর মনেও প্রশ্ন জাগে, এ কি পরীক্ষা দিতে যাওয়া, নাকি রীতিমতো যুদ্ধে যাওয়া? দৃশ্যটা তৈরি করে পরিচালক দর্শকদের কাছে এ বার্তাও পৌঁছে দেন যে, সে বার মাত্র সাড়ে তিন হাজার কনস্টেবল পদের জন্য পঁচিশ লক্ষ চন্দন-শোয়েব লড়েছিল। ধর্ম বা জাতে যত পার্থক্যই থাক গরিব খেটেখাওয়া মানুষের জীবনযাত্রায় যে আদতে কোনও ফারাক নেই, পরস্পরের দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে ব্যগ্র মেহনতি মানুষ যে জাত কিংবা ধর্মের তোয়াক্কা করে না, নীরজ ঘাওয়ান ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই শোয়েবের পঙ্গু বাবা যেমন হাঁটু প্রতিস্থাপনের খরচের কথা শুনেই চিকিৎসা বন্ধ করা ছাড়া অন্য পথ খুঁজে পান না, হারিয়ে যেতে দিতে বাধ্য হন তাঁর চাষের জমিতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাকে, তেমনই চন্দন উদ্বেগ প্রকাশ করলে তার দিনমজুর মা নিজের বীভৎস ভাবে ফেটে যাওয়া পায়ের পাতা দেখিয়ে বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে ওটাই তিনি পেয়েছেন। মেরামতের টাকা না থাকায় ভেঙে ভেঙে পড়ে তাঁর ঘরের চালা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতের অগণিত গ্রামে দিনদরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকার প্রতিদিনের লড়াই চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে চন্দন আর শোয়েবের পরিবারের দিনযাপনের দৃশ্যগুলিতে। অথচ গরিবির বিরুদ্ধে নিত্যকার এই লড়াই এইসব মানুষের মনের সরস মাধুর্যকে যে কেড়ে নিতে পারে না, ছোট ছোট ঘটনায় তাও দেখাতে ভোলেননি নীরজ। তাই চন্দন ভালোবাসে বলে ঈদের দিনে শোয়েবের মা তার জন্য বিরিয়ানি আলাদা করে তুলে রাখেন। কোম্পানিতে কাজে যাওয়ার প্রথম দিন শোয়েবের জন্য নিজের তুলে রাখা শার্ট ইস্ত্রি করে নিয়ে আসে চন্দন। আজ যখন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ধোঁয়ায় শ্বাসরোধী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, একাংশের মধ্যে সেই বিষ কী ভাবে চারিয়ে গেছে, অনবদ্যভাবে তা তুলে ধরেছেন নীরজ। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরিমিতিবোধকে বিশেষ বাহবা দিতে হয়। একটি দৃশ্য আছে যেখানে চ¨নের মা’কে মিড ডে মিল রান্নার কাজ থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, দলিত বলে। সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় সেই ফ্রেম। অফিসে নিজের যোগ্যতা, বিশ্বস্ততার প্রমাণ প্রথম দিন থেকে দেওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার তার এক ঊর্ধ্বতন অফিসার শোয়েবের মা-বাবার আধার কার্ডও চেয়ে বসেন এবং নির্ঘাত শোয়েবের কাছে ও সব নেই, এমন একটা সন্দেহের ছায়া ফুটে ওঠে তাঁর মুখেচোখে। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ উপলক্ষে অফিসের বড়কর্তা পার্টি দিলে শোয়েব সেখানে নিমন্ত্রণ পায়। কিন্তু ম্যাচে পাকিস্তান হেরে গেলে শুধুমাত্র ধর্ম পরিচয়ের কারণে শোয়েবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সমর্থক হওয়ার মিথ্যা অভিযোগ তুলে বার বার তাকে অপমান করা হয়। শেষ পর্যন্ত আর সহ্য হয় না শোয়েবের। প্রতিবাদ করে সে চাকরি ছেড়ে দেয়। অথচ এই শোয়েবই টাকা রোজগারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজের দেশ, নিজের গ্রাম ছেড়ে দুবাই যাওয়ার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিল। পার্টিতে শুধু মুসলমান হওয়ার ‘অপরাধে’ চরম অপমানিত শোয়েবের রাগত, যন্ত্রণাকাতর মুখ দর্শককে ধাক্কা দিয়ে যায়, গলার কাছে কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে। এই জায়গায় পরিচালক এমন মুন্সিয়ানার সঙ্গে দৃশ্যটি রচনা করেছেন যে, নিতান্ত উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাবের শিকার না হলে যে কোনও স্বাভাবিক বোধসম্পন্ন মানুষের বিবেক কেঁপে উঠতে বাধ্য। এখানেই শিল্পের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় শাসকের রাজনৈতিক অপকৌশল। ফিল্মটির শেষার্ধের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই নীরজ তুলে ধরেছেন কোভিড শুরু হওয়ার পর খেটেখাওয়া মানুষ, বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের আচমকা লকডাউন ঘোষণার তীব্র অভিঘাত। টুকরো দৃশ্যের মাধ্যমে কাজ হারানো ভুখা শ্রমিকদের ভিন রাজ্য থেকে ঘরমুখো দুঃসহ অভিযান, তাদের অসহনীয় উদ্বেগের ছবি সুদক্ষতায় উপস্থিত করেছেন পরিচালক। গ্রামে ফিরে যাওয়ার দীর্ঘ পথটিতেই শোয়েব-চন্দনের বন্ধুত্বের চরম পরীক্ষা হয়ে যায়। চরাচরব্যাপী শূন্য খেতের মাঝে হাইওয়ে ধরে অসুস্থ চন্দনকে শোয়েবের পিঠে বয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যে পর্দা জুড়ে যেন হাহাকার বেজে ওঠে। দর্শক প্রশ্ন না করে পারেন না, অতিমারী সামাল দেওয়ার নামে শতসহস্র নিরুপায় মানুষকে এই ভাবে রাস্তায় নামিয়ে দেয় যে শাসকরা, তারা কাদের প্রতিনিধি? লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে লক্ষ লক্ষ ঘরছাড়া মেহনতি মানুষের কী হবে, সেটুকু ভাবার দায়িত্বটুকুও সরকার নেয় না কেন? এ দেশ তবে কার? শোয়েবের তো নয়ই, চন্দনেরও কি? কিন্তু না, হাহাকারের মধ্যে দিয়ে এ সিনেমা শেষ করেননি পরিচালক। দেখিয়ে গিয়েছেন, এ দেশ আসলে শোয়েব আর চন্দনদেরই। হাজারো ঝড়-ঝাপটা, চরম দারিদ্র, ধর্ম-জাতপাতের বৈষম্যজনিত অপমানের মুখোমুখি হয়েও কিন্তু জীবনযুদ্ধের ময়দান ছাড়ে না তারা। শাসকের উদাসীনতা অপদার্থতায় হয়তো জীবন চলে যায়, কিন্তু মরে যাওয়ার আগে ইউপিএসসি-র পরীক্ষায় বসে এসপি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে কলেজে ভর্তি হওয়ার ফর্ম ভরে রেখে যায় চন্দন। শুধু নিজের জন্য নয়, শোয়েবের জন্যও ফর্ম ভরে রাখে সে। এবং সেই ফর্মে চন্দন আর নিজের জাতি-পরিচয় গোপন করে না, পদবী-সহ নিজের নাম লেখে, টিক দেয় তফশীলি জাতির বিভাগটিতে। মৃত চন্দনকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে গ্রামে ফেরার পথে শোয়েব আবিষ্কার করে সেই দুটি ফর্মের কাগজ। এখানেই মনে পড়ে যায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের কথা। দেশভাগ, দারিদ্র, মানুষের ওপর মানুষের শোষণ, যন্ত্রণা, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা প্রতিটি ছবিতে তুলে ধরতে ধরতেও তিনি কিন্তু হতাশার ঠিকানায় যাত্রা সমাপ্ত করেননি। হাজারো নিরাশার মধ্যে ছোট্ট হলেও আশার একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে গেছেন শেষপর্যন্ত। আজ সমাজ জুড়ে যখন দিশাহীনতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত শূন্যতা, আজ যখন হিংস্রতার উল্লাসকে উপজীব্য করে তৈরি হয়ে চলেছে একের পর এক ফিল্ম, সরকারি বদান্যতায় ইতিহাসের নামে বিকৃত সত্যের প্রবল প্রচার করা হচ্ছে একের পর এক সিনেমায়, তখন বেকারি, দারিদ্র, সাম্প্রদায়িকতার অন্ধকারের মাঝে মানবিক সম্পর্কের পতাকাকে দৃৃঢ় হাতে তুলে ধরে ‘হোমবাউন্ড’। আশা জাগে। আজ যখন শাসকের সুরে সুর মেলানোই রীতি, সুযোগ-সুবিধা, নাম-ডাক, টাকা রোজগারের একমাত্র উপায়, তখন এমন সিনেমা তৈরি করতে বুকের পাটা লাগে। সেই কাজটি করে নীরজ ঘাওয়ানরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, এখনও শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তোলার মতো মানুষ দেশে বেঁচে আছেন। তাই দেশের প্রতিটি প্রান্তে লাখো মানুষের কাছে এ ছবি পৌঁছে দেওয়া নিতান্ত জরুরি। সে কাজে সরকার বা সিনে-ব্যবসায়ী, কারও তরফেই বিশেষ উদ্যোগ দেখা যাওয়ার কথাও নয়, যায়ওনি। সেই দায়িত্ব নিতে হবে গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন শুভবুদ্ধির মানুষকেই। ¤ (পথিকৃৎ-এর জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte