সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

"অ্যাডোলেসেন্স" - কৈশোরের আয়নায় সমাজের আত্মসমীক্ষা

সঙ্ঘমিত্রা চট্টোপাধ্যায়

‘‘একদিন ছিল আমাদেরও ছেলেবেলা
দুচোখে স্বপ্ন ছিল দিগন্তগামী,
মাঠের সবুজে ছিল সংযত খেলা
ওদের বুঝি না, সত্যি বুঝি না আমি।’’
নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠী’র ‘ফুটবল’ নাটকের এই সংলাপ ছিল তরুণ প্রজন্মের ক্রমশ পাল্টে যাওয়া মনোজগতের দিকে তাকিয়ে। যত দিন গেছে, মাঠের সবুজ আর দিগন্তছোঁয়া স্বপ্ন থেকে ক্রমশ আরও আরও দূরে সরে গেছে আমাদের শৈশব, আমাদের কৈশোর। অতিমারি পরবর্তী পৃথিবীতে হয়তো এক ধাক্কায় কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে সেই দূরত্ব। আমরা যারা আজকের কৈশোরের অভিভাবক বা বয়সে কিছুটা হলেও বড়, তারা কি এই দূরত্বের অশনি সঙ্কেত আদৌ খেয়াল করেছি? নাকি আমরা ‘এই প্রজন্মকে সত্যি বোঝা যায় না’ বলেই দায় সেরেছি? বোঝার চেষ্টা এখনও না করলে আসন্ন ভবিষ্যতে কী মারাত্মক মাশুল দিতে হবে, সেকথাই মনে করিয়ে দেয় নেটফ্লিক্স-এর চার পর্বের ওয়েব সিরিজ ‘অ্যাডোলেসেন্স’।
তেরো বছরের স্কুল ছাত্র জেমি মিলার’কে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। অভিযোগ, সে গত রাতেই খুন করেছে তার সহপাঠিনী কেটিকে। জেমি’র হতভম্ব মা-বাবা প্রাণপণে বোঝাতে চান, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, এ হতেই পারে না। জেমি সমানে বলে যায়, আমি কিছু করিনি, আমি ভুল কিছু করিনি, আমি অপরাধী নই। খুব স্বাভাবিক ভাবেই দর্শকের মনে ধারণা তৈরি হয়, আর পাঁচটা থ্রিলারের মতোই প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করার পথে এগোবে গল্প। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের সময় জেমি এবং তার বাবার সামনে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখায়, যেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কিছু কথা কাটাকাটি চলতে চলতে কেটিকে নৃশংসভাবে ছুরি দিয়ে খুন করছে জেমি। এখানেই প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। জেমির বাবা ছেলের দিকে তাকাতে পারেন না এবং তার ওই অসহায় মুখ ঢেকে ফেলা আমাদেরও একইভাবে স্তব্ধ করে দেয়। তাহলে এই সেভেন এইটে পড়া বাচ্চা ছেলেটি সত্যিই খুন করেছে? তার পরেও প্রতিদিনের মতো বাড়ি ফিরে সে ঘুমিয়েছে রোজের বিছানায়, পুলিশকে দেখে আর পাঁচটা তার বয়সি ছেলের মতোই ভীষণ ভয় পেয়েছে, থানায় পৌঁছে বারবার বাবার কথা জিজ্ঞেস করেছে এবং বাবার প্রশ্নের উত্তরে বারবার বলে গেছে, আমি কিছু করিনি। এতখানি নির্লিপ্ততা, খুন করে এসে জেরার মুখেও সেটা অস্বীকার করার দুঃসাহস এই বয়সি একটা ছেলে কোথা থেকে পেল? কেন সে খুন করল? এই কেন’র উত্তর খুঁজতে গিয়ে বাকি তিনটি পর্বে আমরা ঢুকে পড়ি এক অন্ধকার জগতে, যে জগত আমাদের খুব সামনেই আছে, অথচ আমরা তার কোনও খোঁজখবর রাখিনি। চোখে ঠুলি পরে ছেলেমেয়েদের ‘নিজের মতো’ বাঁচতে দেওয়ার মোহে আমরা আসলে তাদের ঠেলে দিয়েছি অমানুষ হওয়ার পথে।
কিশোর অপরাধ শব্দটা আজকের দুনিয়ায় নতুন বা অপরিচিত একেবারেই নয়। আমাদের দেশ সহ প্রায় সর্বত্র যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, তারা ভয়ংকর নৃশংস অপরাধ করছে এসবও আমরা জানি। কিন্তু সংবাদপত্রের নিবন্ধ, তথ্য-পরিসংখ্যান আর শিল্পের ফারাক হল এই, যে শিল্প আমাদের জানা জিনিসের ওপরেও নতুন করে আলো ফেলে, অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করে। যেমন, এই ছবির সহ-লেখক এবং জেমির বাবার চরিত্রের অভিনেতা স্টিফেন গ্রাহাম বলেছেন, ‘আমরা চাইলে এই ছেলেটিকে বাবার অত্যাচারের শিকার, বাবা মদ্যপ, বাড়িতে অশান্তি হয় এরকম দেখাতেই পারতাম। কিন্তু আমরা ইচ্ছে করেই একেবারে স্বাভাবিক সাধারণ একটা পরিবার দেখিয়েছি।’ এটা দেখানোর ফলে খুবই সার্থক এবং শিল্পিত ভাবে সমস্ত আপাত নিশ্চিন্ত বাবা-মা’র মনে তারা এই প্রশ্নটা তুলে দিতে পেরেছেন, ‘এরকম একটা পরিবারেও এ জিনিস ঘটতে পারে তাহলে? আমাদের সন্তানও এরকম করতে পারে যে কোনওদিন?’ উত্তর, হ্যাঁ এই আপাত অসম্ভব দুঃস্বপ্নের মতো জিনিস যে কোনও দিন ভয়ংকর বাস্তব হয়ে উঠতে পারে যে কোনও মা-বাবা’র জীবনেই, যদি আমরা সচেতন না হই, সন্তানের বড় হওয়ার ধাপগুলো নজরে না রাখি, তাকে সময় না দিই। এই সিরিজের আরেকটা বড় গুণের দিক হল, ঘটনা এগোচ্ছে একটা খুনকে ঘিরে, উন্মোচিত হচ্ছে ভার্চুয়াল দুনিয়ার এক অদ্ভুত অসুস্থ পরিবেশ, কিন্তু গোটা ছবিতে কোথাও সেই অর্থে ভায়োলেন্স বা হিংসা নেই, বাস্তবতার নামে উগ্রতার ঝোঁক নেই। আছে গভীর দুঃখ আর অসহায়তা। দ্বিতীয় পর্বের শেষে জেমির স্কুলের একটি কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে রাস্তা পেরোয়। নিজের বাড়ির অস্বাভাবিক পরিবেশ, মায়ের সাথে অশান্তির মধ্যে স্কুলে এই কেটি মেয়েটি’র বন্ধুত্ব তাকে একটু শান্তি দিত। ক্যামেরা এই সময় তাকে ছুঁয়ে উঠে যায় অনেক ওপরে, আকাশ থেকে গোটা শহর ছুঁয়ে আবার ধীরে ধীরে নামে কেটি’র খুনের জায়গায়, যেখানে ফুল দিতে এসে কোনওমতে ভেতরের কান্না চেপে দাঁড়িয়ে আছেন জেমির বাবা। নেপথ্যে ভারি নরম একটি গান বাজে কয়ারের মতো, "Tomorrow's rain will wash the stains away– but something in our mind will always stay…that nothing comes from violence and nothing ever could/ For all those born beneath an angry star– lest we forget how fragile we are." এই দৃশ্যটি’র আবেদন বহুদিন মনে ত্থেকে যাওয়ার মতো। আমাদের চারপাশে ভেঙে যাচ্ছে সবকিছু, বিশ্বাস, সম্পর্ক, আজন্ম লালিত বোধ। সিরিজের প্রায় প্রতিটি চরিত্র নিজের অবস্থান থেকে এই ভাঙনের শব্দ শোনে, আর এখানেই শুধু একজন জেমি মিলারের গল্প না হয়ে এই কাহিনী আমাদের প্রত্যেকের ওপর জোরালো আলো ফেলে। যেমন যে পুলিশ অফিসার তদন্ত করছেন, তার নিজের ছেলেও পড়ে জেমির স্কুলেই। বাবা ঘটনাটার কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না দেখে সেই ছেলে বাবাকে আলাদা ডেকে নেয়। নিজের ছেলের কাছে পুলিশ অফিসার জানতে পারেন, ইন্টারনেটে ‘ম্যানোস্ফিয়ার’ নামে একটা জিনিস আছে, যেখানে ছেলেদের পুরুষ হয়ে উঠতে শেখানো হয়। পুরুষ হওয়া বলতে তারা শেখে মেয়েদেরকে যৌন আবেদনে আকৃষ্ট করতে পারা, শেখে নারীবিদ্বেষ, সেখানে নানা ধরনের ইমোজি ব্যবহার করে নানা ধরনের যৌন সংসর্গের ইচ্ছা বা অবস্থান বোঝানো হয়। শোনেন, জেমিকে ‘ইনসেল’ (যৌন সঙ্গী জোটাতে অক্ষম) বলে গালিগালাজ করেছিল এই কেটি মেয়েটি, সম্ভবত সে কারণেই এই মর্মান্তিক পরিণতি। যেসব শব্দের সাথে, যে দুনিয়ার সাথে বাবা হিসেবে, এমনকী আইনরক্ষক পুলিশ হিসেবেও তার কোনও পরিচিতিই নেই, স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা হাতে স্মার্টফোন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন সেই নর্দমার জল পান করছে এবং প্রত্যেকেই বেড়ে উঠছে এক একজন জেমি মিলার হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে, এটা বুঝতে পেরে সেই অফিসারের মতোই আমরাও অসুস্থ বোধ করি। ইয়োরোপ আমেরিকা’র স্কুল মানে সেখানে দারুণ পড়াশুনা এবং সুশিক্ষা চলে, এই ভুল ধারণাও অনেকটা কেটে যায় এই সিরিজ দেখলে। স্কুল, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী সকলেই চলছে নিজের মতো। কোথাও কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, পারস্পরিক শ্রদ্ধা নেই, শেখার পরিবেশ নেই। কিন্তু প্রায় প্রতিটি হাতে একটি করে স্মার্টফোন আছে, আছে অনন্ত রিলসের হাতছানি। কিশোরদের ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠছে অ্যান্ড্রু টেট বা তার মতো কোনও নারীবিদ্বেষী ইনফ্লুয়েন্সার, যারা শেখায়, আশি শতাংশ মেয়ে কুড়ি শতাংশ ছেলের প্রতি আকৃষ্ট হয়, ফলে ওই কুড়ি শতাংশে পৌঁছাতেই হবে এবং তার জন্য নিজের মধ্যে যৌন আবেদন তৈরি করতে হবে। তেরো বছরের জেমি যখন সামনে বসা মহিলা মনোবিদকে বেশ মেজাজ নিয়ে বলে, ‘আমি চাইলেই ওকে (নিহত কেটি) ছুঁতে পারতাম, ওর যে কোনও জায়গায় স্পর্শ করতে পারতাম, অন্য কেউ হলেই তাই করত। কিন্তু আমি করিনি। আমি কি ভালো নই?’ তখন আমাদের শিউরে উঠতে হয়। এই শিউরে ওঠা, ভয় পাওয়া প্রয়োজনীয়। কিন্তু তারপর? এ সিরিজের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জায়গা শেষ পর্বের শেষ অংশটি। জেমি আছে কিশোর সংশোধনাগারে। মাসের পর মাস এই ভয়ংকর ঝড়ের সাথে জুঝতে জুঝতে ভয়ানক ক্লান্ত জেমির বাবা, মা, দিদি। এই পরিবারটির গা থেকে তথাকথিত পাশ্চাত্যের গ্ল্যামার একেবারে ঝেড়ে ফেলে এমনভাবে তাদের পর্দায় তুলে আনা হয়েছে যে, আমাদের পাশের বাড়ির নাচার মা-বাবা’র সাথে তাদের কোনও পার্থক্য থাকে না। বাবা’র জন্মদিনের সকালে জেমি ফোন করে বাবা’কে শুভেচ্ছা জানায়, আর এতদিনে প্রথমবার সে বলে, এবার সে আদালতে নিজেকে ‘দোষী’ বলতে চায়, অপরাধ স্বীকার করতে চায়। একদিকে এই স্বীকারোক্তি আনন্দের, আবার এর মানে আরও দীর্ঘ, হয়তো আজীবনের বন্দীদশা। যে মা-বাবা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রাণপণে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে যাচ্ছেন, তারা একান্তে পরস্পরের পাশে বসেন। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায় যন্ত্রণায়, মনে পড়ে জেমি’র কচিমুখ, মনে পড়ে সে কেমন সুন্দর ছবি আঁকত ছোটবেলায়। তারপর এক সময় বড়ো হল, একটা কম্পিউটার চাইল, তাই কিনে দেওয়া হল। জেমির বাবা সাধারণ কল মেকানিক, তিনি ছেলের কোনও আবদার তাও অপূর্ণ রাখেননি। ছেলে সকাল থেকে বন্ধ দরজার আড়ালে কম্পিউটারের সামনে বসে কী করছে কী দেখছে, কেন রাত একটা পর্যন্ত একটি এই বয়সি ছেলের ঘরে আলো জ্বলে এসব জানার প্রয়োজনও বোধ করেননি তারা। ভেবে নিয়েছেন, ওর জীবন ওর মতো করে চলুক। জেমির বাবা বলেন, ‘আমার বাবা আমাকে বেল্ট খুলে মারত, আমি ঠিক করেছিলাম আমার সন্তানের সাথে আমি কোনোদিন এমন করব না। আমি তো করিনি, আমি তো ভালো বাবা হতে চেয়েছি। আমি কি ভালো হতে পারলাম?’ স্বামীর পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে জেমির মা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন, আর কান্না ধরা গলায় অস্ফুটে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের নজর রাখা উচিত ছিল, ওকে থামানো উচিত ছিল।’ জেমির বাবা যখন একা ঘরে ছেলের বিছানার ওপর উপুড় হয়ে কাঁদছেন, তার এতদিনের হাহাকার বুকফাটা কান্না হয়ে বেরিয়ে আসছে, তখন একবারও মনে হয় না এ অনেক দূরের দেশের ঘটনা। ছেলের গায়ে হাত বোলানোর সুযোগ নেই, তার বিছানায় শোওয়ানো ছোট্ট পুতুলটাকেই চুমু খেয়ে বাবা বলে ওঠেন, ‘আমায় ক্ষমা করে দিস বাবা, আমার আরও ভালো হওয়া উচিত ছিল।’ সন্তানকে কোনও রকম শাসন না করে, নিজেদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও তার যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে, তার কোনও ইচ্ছে-অনিচ্ছে’তে বাধা না দিয়ে এই সমাজে অসংখ্য বাবা-মা ভালো অভিভাবক হয়েছেন বলে মনে করছেন। তাঁদের এই মানসিকতা তৈরি করেছে আজকের বাজার, মিডিয়ার প্রচার। দিবারাত্র ফোন আর ইন্টারনেটে ডুবে থাকতে থাকতে সন্তান কখন একটা সমান্তরাল অন্ধকার দুনিয়ায় ঢুকে পড়ছে, তারা টেরও পাচ্ছেন না। ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’র এই প্রচলিত ধারণাকেও জেমির বাবার কান্না এক বিরাট প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যায়।
আশার কথা, বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষ ‘অ্যাডোলেসেন্স’ দেখেছেন, সিরিজটি নিয়ে সমাজ মাধ্যমে সংবাদপত্রে বহু আলাপ-আলোচনা চলছে। অধিকাংশ ওয়েব সিরিজের চর্বিত-চর্বণের ভিড়ে মানুষের জীবনের জ্বলন্ত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত বলেই সিরিজটি প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছে। ভারতবর্ষের পরিবেশ-পরিস্থিতি যে কোনোভাবেই এর চেয়ে ভালো নয়, সে কথা আজ কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয়না। ২০১০ থেকে ২০১৪ এই ক’ বছরে ভারতে নাবালকদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ বেড়েছিল ৪৭ শতাংশ, তার পরের দশ বছরে বেড়েছে আরও বেশি, ৬০ শতাংশ। শুধুমাত্র ২০২২ এ দেশে এই ধরনের কিশোর অপরাধের সংখ্যা তিরিশ হাজার পাঁচশো পঞ্চান্ন। ২০২৩ এর একটি গবেষণামূলক পত্রিকা ৪৬৩ জন ভারতীয় ছাত্রের ওপর সমীক্ষা করে অর্ধেকেরও বেশির মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখতে পায়। ২০২০ তে দিল্লিতে একটা ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, যেখানে একটি ইন্সটাগ্রাম গ্রুপ চ্যাটে বিভিন্ন নামকরা স্কুলের ছেলেরা নারীদেহের উত্তেজক ছবি শেয়ার করছে, যৌনগন্ধী মন্তব্য করছে। এদের সবার বয়স পনের থেকে সতেরোর মধ্যে এবং নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তারা আদৌ অনুতপ্ত নয়। এই ২০২৫-এ মহারাষ্ট্রের নাসিকে একটি স্কুলে এইট থেকে টেনের ছাত্রছাত্রীদের ব্যাগ চেক করে পাওয়া গেছে ছুরি, সাইকেলের চেন, কনডোম সহ নানা নিষিদ্ধ জিনিস। নারী নির্যাতন কি হারে বাড়ছে এবং এ ধরনের অপরাধে কিশোরদের যুক্ত থাকার সংখ্যাও যে বেড়ে চলেছে তার হাজার পরিসংখ্যান মিলবে। আমাদের চারপাশটা কেন কবে এমন হয়ে গেল? আমাদের করণীয়ই বা কী? সন্তানকে সময় দেওয়া, বয়ঃসন্ধির টালমাটাল মনের কথা শোনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কাউন্সেলিং এ সবই প্রয়োজন। কিন্তু মা-বাবা’র ঘেরাটোপের বাইরে বা মনোচিকিৎসকের ঘর থেকে বেরিয়ে তো জেমি মিলার’দের বাঁচতে হবে এই সমাজে, এই স্রোতে। যেখানে সর্বক্ষণ তার বাড়িতে শিখে আসা ধ্যানধারণা-মূল্যবোধের সাথে প্রবল সংঘাত চলবে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে চাইবে তার মনের দুনিয়াটা। তখন সে লড়বে কী নিয়ে? এর উত্তর ‘‘অ্যাডোলেসেন্স’ এর দিতে পারার কথা নয়। যতই আমরা পুঁজিবাদ শুনলেই রাজনীতির কথা ভেবে এড়িয়ে যাই, আমাদের প্রিয় সন্তানদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণটি এই পুঁজিবাদী আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যেই আছে। এই ব্যবস্থা শুধু দারিদ্র, বেকারি সৃষ্টি করে না, মনুষ্যত্বকেও ধ্বংস করে, মানুষে মানুষে স্বাভাবিক আদান প্রদান, সম্পর্ক, বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। তাই যে দেশে দাঁড়িয়ে সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘এ দেশের বুকে আঠেরো আসুক নেমে’, সে দেশের মাটিতেই নির্ভয়ার গনধর্ষণে-হত্যায় সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার পরিচয় দেয় যে, তার বয়সও ওই আঠেরোর আশেপাশে। বোঝা দরকার, আজকের নবীন কিশোরের সামনে অতীতের মূল্যবোধ নেই, ক্ষুদিরাম-নেতাজী-ভগত সিং-প্রীতিলতা’র জীবন নেই। আবার আজকের সমাজের সত্যিকারের উন্নত চরিত্রের সাথেও তার পরিচয় ঘটে না সেভাবে। নেই সবুজ মাঠ, খোলা আকাশ, ভরসা করার মতো বন্ধু বা মন খুলে কথা বলার অবসর। অথচ ঢালাও মদের লাইসেন্স আছে, পর্ণ সাইটের হাতছানি আছে, নগ্ন নারীদেহের প্রদর্শন আছে। আছে শুধুই নিজের বহিরঙ্গকে ‘স্মার্ট’ বানিয়ে তোলার হাতছানি। এই অন্ধকার কিছুটা কাটতে পারে একমাত্র বিকল্প সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, মনীষীদের স্মরণীয় উত্তরাধিকারের চর্চায়।
‘আমাদের ছিল আকাশে সূর্য-তারা, ওদের আকাশে ফুটবল কমদামি/ গড়িয়ে চলেছে হিংস্র ঠিকানা হারা, ওদের বুঝি না সত্যি বুঝি না আমি’। এই না বোঝার হতাশা আমাদের চারপাশে ছিলই। কিন্তু সূর্য, তারা আর ফুটবলের মাঠ বয়ঃসন্ধির আকাশ থেকে কেন হারিয়ে যাচ্ছে, সেই উত্তর খোঁজার আশু প্রয়োজন এবং দায় আমাদের মনে করিয়ে দিল ‘অ্যাডোলেসেন্স’। ¤
(পথিকৃৎ-এর এপ্রিল ২০২৫ সংখ্যা থেকে নেওয়া)

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte