সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সীমান্তহীন পৃথিবীর জন্য

সঙ্ঘমিত্রা চট্টোপাধ্যায় | রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

"খানিকটা নাম ধানখেতে পড়ে গেছে
খানিকটা গেছে নদীজলে আঘাটায়
খানিকটা নাম নিয়ে নিল পাঠশালা
খানিকটা গেল রাস্তার কান্নায়
যে গাছের নিচে জিরোতে বসেছিলাম
খানিকটা নাম সেই গাছটায় আছে
খানিকটা নাম মাঠের শিশির নিল
খানিকটা গেছে রাত পড়শির কাছে
খানিকটা নাম বেড়ায় আটকে গেল
খানিকটা গোঁজা রইল খড়ের পাতায়
খানিকটা নাম কাঁটাতারে তারে বেঁধা
খানিকটা যায় ইমিগ্রেশন খাতায়।"
('নন্দর মা', জয় গোস্বামী)

দেশভাগের এই যন্ত্রণা ছিল আমাদের অতীত ইতিহাস। ধর্মের ভিত্তিতে একটা দেশকে দু টুকরো করে দেওয়ার মারাত্মক পরিণাম, ভিটেমাটি ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের সীমান্ত পেরিয়ে আসার আতঙ্ক, অসংখ্য দাঙ্গা-ধর্ষণ-হত্যা-মৃত্যুর সেই ভয়াবহ সময়টা আমরা বইয়ের পাতায় দেখেছি, দেখেছি সাহিত্যে-সিনেমায়। ঋত্বিক ঘটক দেশভাগের ক্ষতকে সেলুলয়েডে উৎকীর্ণ করে গিয়েছিলেন আমাদের জন্য, যারা ' যুদ্ধ দ্যাখে নাই, অ্যাটম বোমা দ্যাখে নাই, মন্বন্তর দ্যাখে নাই, দেশভাগ দ্যাখে নাই।" দেশভাগ বেঁচে ছিল নন্দ'র মা আর সালেমনের মা'দের দগদগে স্মৃতিতে। ইতিহাসকে যেমনভাবে পড়া উচিত, তেমন ভাবেই আমরা জেনে এসেছি, এমন জঘন্য ভাগাভাগি আর যাতে কখনও ঘটতে না পারে, মানুষকে যাতে আর উচ্ছিন্ন না হতে হয়, উদ্বাস্তু মানুষের মিছিল যাতে আর না দেখতে হয়, তেমন দুনিয়াই আমরা চাই। অথচ একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এই পুঁজি এবং প্রযুক্তি শাসিত সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা আবার ভূগোলক জুড়ে যুদ্ধের হুঙ্কার শুনছি, মিসাইল-বোমায় আহত অগুন্তি শিশুর শব দেখছি, দেখছি অপুষ্টিতে ভোগা কঙ্কাল-শরীরের মানুষ এবং বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু, শরণার্থী মানুষের ঢল।

বছর বারোর মেয়ে রোজিনার ছবি, ভিডিও বারবার ভেসে উঠছে আমাদের ফোনে। কদিন আগেও রোজিনা একটা স্কুলে যেত। ছিল বইখাতার অক্ষর, দিনের শেষে ভাইবোনেদের সাথে খুনসুটি। রোজিনা এখন বসে আছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। বড় বড় চোখ দুটো বারবার ভরে উঠছে জলে। মলিন জামার হাতায় কোনওমতে চোখ মুছে সে সাংবাদিক'কে বলছে - 'দুই দিন ধরে এখানে এইভাবে পড়ে আছি। খাওয়া নেই দাওয়া নেই, গা ধোওয়া নেই...।' বলতে বলতেই আবার ভেতর থেকে ঠেলে উঠছে কান্না। সাংবাদিক প্রশ্ন করেন - 'তুমি কি স্কুলে পড়তে?' 'হ্যাঁ পড়তাম। ক্লাস সিক্সে।....আমাদের যদি ওটাই দেশ হয় (বাংলাদেশ), ওখানেই তাহলে পাঠিয়ে দিক।' রোজিনা থাকত এই কলকাতা শহরের বুকেই। জীবনে বন্ধু ছিল, পড়াশুনা ছিল, চরম দারিদ্র্যের অন্ধকার পেরিয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্নও ছিল হয়তো। মে মাসের শেষে সেই আস্তানা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কোনও ক্যাম্পে তাদের কিছুদিন গুঁজে রেখেছিল সরকার। তারপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছে বর্ডারে। রোজিনা, তার ন'মাসের অন্ত:সত্ত্বা মা, বাবা, এক বিকলাঙ্গ ভাই সহ ছোট ছোট ভাইবোনেরা কেউই জানে না কোনটা তাদের দেশ! আদৌ কি এই বিরাট পৃথিবীর বুকে এক টুকরো জমিও তাদের? রোজিনা'দের মাথার ওপর ভরা জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ, পায়ের নিচে দগ্ধ ঘাস, আর চারদিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধুই দিগন্তজোড়া শূন্যতা। গরমের প্রকোপ থেকে শিশুদের বাঁচাতে যখন রাজ্যের স্কুলে স্কুলে মর্নিং শিফট চালু করা হয়েছে, বহু বেসরকারি স্কুলে এখনও গরমের ছুটি চলছে, তখন রোজিনার মতো একটি মেয়ে খোলা আকাশের তলায় বসে আছে দেশহীন হয়ে, আতঙ্কে কাটাচ্ছে দিন-রাত, সোশ্যাল মিডিয়া না থাকলে এ'কথা হয়তো জানতেও পারতাম না আমরা।

আরেক বৃদ্ধের ভিডিও ভেসে উঠছে ফেসবুকে। মাথায় চুল নেই বললেই চলে, দু গালে পাকা দাড়ি, আধময়লা গেঞ্জি আর লুঙ্গি গায়ে দাঁড়িয়ে আছেন বর্ডারে। তাঁকে দুদিক থেকে ঘিরে ধরেছে বিএসএফ আর বিজিবি। চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। 'ইন্ডিয়ায় ছিলে পাঁচদিন? না বাংলাদেশে পাঁচদিন ছিলে? পাঁচদিন ছিলে মানে কী? বাংলাদেশেই বাড়ি তো তোমার?' বৃদ্ধ মানুষটি কখনও বিড়বিড় করে, কখনও কেঁদে ফেলে, নাক মোছে, পালাতে চায়। শব্দ বেরোয় না গলা থেকে। এদিকে যায়, বিএসএফ হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। ওদিকে যেতে চায়, বিজিবি খেদিয়ে দেয়। একটা আস্ত মানুষ, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকা বুড়োমানুষ, যার একমাত্র চাওয়া দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকা, সে মানুষটা সীমান্ত জুড়ে ছুটছে, তাড়া খাচ্ছে, বসে পড়ছে আহত জন্তুর মতো। এ যেন অবিকল সাদাত হাসান মান্টোর গল্প থেকে উঠে আসা বুড়ো বিষাণ সিং, যে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার ফেলে আসা গ্রাম টোবা টেক সিং এর ঠিকানা - ভারত না পাকিস্তান? পাকিস্তান না ভারত? আজ এই ২০২৬ এর জুন মাসে, সীমান্তের এপার থেকে ভারতবর্ষ, ওপার থেকে বাংলাদেশ দেখছে দুদিকের কাঁটাতারের মাঝে খাঁচায় বন্দী পশুর মতো অসহায় এই মানুষগুলোকে, যারা জানে না ভারত না বাংলাদেশ কোনটা তাদের দেশ, একবিংশ শতাব্দীর 'আধুনিক' রাষ্ট্রের চোখে যারা 'অবৈধ'।

বিগত কিছু বছর ধরে কিছু কিছু শব্দ খুব পরিকল্পিত ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের মগজে, আমাদের চর্চায়। যেমন - ঘুসপেটিয়া, অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা, টুকরে টুকরে গ্যাং, অবৈধ ভোটার, অবৈধ নাগরিক। কাল্পনিক হোক বা বাস্তব, দু কোটি হোক বা দু-কুড়ি, যাবতীয় সমস্যার জন্য দায়ী ওরাই। এ শব্দগুলো যত চেপে বসছে, ততো দূরে সরে সরে যাচ্ছে মানবাধিকার, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি, অপুষ্টি'র মতো শব্দগুলো। নির্বাচনে গদি দখলের জন্য এ রাজ্যের প্রায় এক কোটি মানুষের নাগরিকত্বকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হল, সাতাশ লক্ষ নাম আজও ঝুলছে ট্রাইব্যুনালে। অন্যদিকে, সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে দেখছি, সীমান্তে আটকে পড়া এই ছোট্ট মেয়েটির, ওই বৃদ্ধের লাঞ্ছনা দেখে কষ্ট পাওয়ার বদলে কদর্য মন্তব্য করছেন অনেকে, পাশবিক উল্লাসে ফেটে পড়ছেন এক দল, চেহারা যাদের মানুষেরই মতো। পাশের বাড়ির ছোট্ট ছেলেটি কাজী নজরুল ইসলামের নাম জানার আগেই কখন যেন জেনে যাচ্ছে, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান আমাদের শত্রু। মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের নির্মমতার চেয়েও ভয়াবহ রাষ্ট্রের এই প্রকল্প - মনের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা, যুক্তিবোধ, চিন্তার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেওয়া।

ভোটের আগে যে বিপুল সংখ্যায় রোহিঙ্গা আর অনুপ্রবেশকারীর মনগড়া গল্প শোনানো হয়েছিল সেই কোটি কোটি মানুষ গেল কোথায়? খাতায় কলমে ক'জন 'ঘুসপেটিয়া' চিহ্নিত করা গেল? বছরের পর বছর এদেশে ভোট দিয়ে আসা যে লাখ-লাখ মানুষকে বেনাগরিক করে দেওয়া হল, তাদের অপরাধ কী ছিল? শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বর্ডারে বসে থাকা এই মানুষগুলোর কাছে যদি বৈধ পরিচয়পত্র না থাকে, নেই কেন? নেই, কারণ এরা সমাজের সেই অংশের মানুষ, যারা আজন্ম বঞ্চিত। যাদের জন্য শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, চাকরি নেই; যাদের ঘর বারেবারে ভেসে যায় ভেঙে যায় ঝড়ে-বন্যায়-বুলডোজারে। এরা শরৎচন্দ্রের সেই মানুষ, 'নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনওদিন ভেবেই পেল না, সমস্ত কিছু থেকেও তাদের কেন কোনও কিছুতেই অধিকার নেই।' জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে-নাগরিকত্বের কাগজ থাকা যতোটা জরুরী, প্রায় ততোটাই অসাধ্য এই মানুষগুলোর জীবনে। তাহলে নাচার মানুষগুলোকে সেই পরিচয়পত্র নতুন করে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কার? মানুষগুলো যদি বাংলাদেশেরই নাগরিক হয়, তারা যাতে নিজের দেশে নিরাপদে ফিরতে পারে, নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? একজন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর মানবাধিকারও পুলিশ-প্রশাসন লঙ্ঘন করতে পারে না। সেখানে শুধুমাত্র কাগজ নেই বলে এই মানুষগুলো খোলা আকাশের নিচে নিঃসম্বল বসে থাকবে খিদে-তেষ্টা-যন্ত্রণা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আতঙ্ক নিয়ে? দুই দেশের রাষ্ট্রনায়করা দয়া করে যতক্ষণ না এতগুলো প্রাণের একটা সুরাহা করার কথা ভাববেন, ততোক্ষণ ততোদিন শুধু অপমান আর অসম্মানের পাহাড় বুকে নিয়ে দিন গুণবে তারা? দেশের জল-জঙ্গল-জমি দিনের পর দিন একচেটিয়া পুঁজির হাতে তুলে দিচ্ছে যারা, তারা বৈধ। দেশের মানুষের লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে বিদেশে পালাচ্ছে যারা তারা বৈধ। 'অবৈধ' শুধু গরিব, সংখ্যালঘু মানুষ? আজ যারা এদেশের ক্ষমতায় আসীন, তারা কথায় কথায় বেদ-উপনিষদের মাহাত্ম্য প্রচার করে থাকেন। উপনিষদের শ্লোক বলছে - 'উদারচরিতানাম তু বসুধৈব কুটুম্বকম' (উদার চরিত্র মানুষের কাছে গোটা পৃথিবীই আত্মীয়)। অথচ মানুষকে আপন করা, কাছে টানার পরিবর্তে দেশের সুরক্ষা'র নামে কতগুলো নিঃস্ব অসহায় মানুষকে ধুলোবালির মতো ঝেড়ে ফেলা হচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমাগত তোলা হচ্ছে বিভেদের পাঁচিল। UNHCR (ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস) এর তথ্য বলছে, বিশ্ব জুড়ে ১ কোটি ১৭ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ-হিংসা-নিপীড়ন থেকে বাঁচতে অন্য দেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৫ য় তুরস্কের সমুদ্রসৈকতে ভেসে এসেছিল তিন বছরের ফুটফুটে আয়লান কুর্দির নিথর দেহ। ২০২৩ এর অক্টোবর থেকে প্যালেস্টাইনে মার্কিন-ইজরায়েল হানায় মৃত শিশুর সংখ্যা কুড়ি হাজার। মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার এভাবে দলে পিষে দিচ্ছে যারা, সেই মুনাফালোভী যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈধতা তাহলে কতোখানি? এই প্রশ্নগুলো তোলার পরিসর যতো কমিয়ে আনা হচ্ছে, ততোই জরুরী হয়ে উঠছে প্রশ্নগুলো একটানা করে যাওয়া।

প্যালেস্টাইনে ফিদা কিশতা'র বাড়ি ২০০৪ সালে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল ইজরায়েলি বুলডোজারে। ২০১৩ তে মুক্তি পেয়েছে প্যালেস্টাইন নিয়ে তাঁর তথ্যচিত্র 'হোয়্যার শুড দ্য বার্ডস ফ্লাই'। ছবিটি শেষ হয় সমুদ্রতীরে সূর্যাস্তের দৃশ্য দিয়ে। ছোটবেলায় ফিদা বাবাকে জিজ্ঞাসা করতেন, 'বাবা, সূর্যটা যায় কোথায়?' বাবা উত্তর দিতেন, 'সূর্য এখন অন্য কোথাও অন্য কাউকে আলো দিচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি না মানে এই নয় যে, সূর্যটা কোথাও নেই।' দুনিয়া জুড়ে প্রতিরোধের সূর্য উঠছে। সীমান্তে বসে থাকা মানুষের কান্না, বোমায় ছিন্ন শিশুর দেহ, পে লোডারে করে বর্ডারে ছুড়ে দেওয়া মানুষের মুখ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, এ রাষ্ট্র আসলে ক্ষমতার, কাঁটাতার আর যুদ্ধবিমানের। রাষ্ট্রের এই অমানবিক মুখ যতো ভয়ংকর হবে, ততো আসন্ন হবে শেষ যুদ্ধের মুহূর্ত, যেদিন সীমান্তসন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই মানুষ লড়বে সীমান্তহীন পৃথিবীর জন্য। □

আপনার মতামত অন্যান্য পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করুন
মতামত দিন
মতামতসমূহ
Anjanava Chakraborty
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

মর্মান্তিক ঘটনার যে বিবরণ তুলে ধরেছেন আপনারা তার প্রতিকার মানুষ একদিন করবেই

Anjanava Chakraborty
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

মর্মান্তিক ঘটনার যে বিবরণ তুলে ধরেছেন আপনারা, এর প্রতিকার মানুষ করবেই।

পথিকৃৎ

আমাদের পত্রিকা ওয়েবসাইটের সাথে যুক্ত থাকুন এবং সর্বশেষ খবর ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট নিয়মিত পান

যোগাযোগ

পথিকৃৎ
৮৮বি বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট
কলকাতা ৭০০০১২

দূরাভাষ- 9433046280, 9433451998
ইমেইল- pathikritpatrika@gmail.com

গুরুত্বপূর্ণ লিংকসমূহ

© Pathikrit. All Rights Reserved. Designed By GenxByte